গল্পঃ বউ পাগল। ( ৩য়

0
গল্পঃ বউ পাগল। ( ৩য় এবং শেষ পর্ব ) গ্রামের লোকজন এখন আমাকে “বউ পাগল” বলে ডাকে, উদ্দেশ্য আমাকে ক্ষ্যাপানো। কিন্তু এতে আমার বেশ ভালোই লাগে। বউ পাগলা উপাধি বেশ পছন্দ হয়েছে আমার, বউকে ভালোবাসা তো দোষের কিছু নয়। যাকে আপনি একটি ঘর দিলেন, সে আপনাকে একটি সাজানো সংসার গড়ে দিলো, সুতরাং তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং অতিরিক্ত ভালোবাসা থাকাটা অন্যায় কিছু নয়। সকালে আমি বাইরে থেকে এসে মীমের পাশে বসতেই মিম বললো,– তোমাকে যে মানুষরা বউ পাগলা কয়, খারাপ লাগেনা? আমি মুচকি হেসে মিমকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু খেয়ে বললাম,– মানুষরা তো মিথ্যা বলেনা, তুমি তো আমার জান পাখি, আমি তো তোমার জন্য পাগল ছিলাম, পাগল আছি, পাগল থাকবো। এটা মানুষরা বললে খারাপ লাগার কী আছে? আমার তো ভালোই লাগেরে বউ। মিম আমার চোখে চোখ রেখে মিষ্টি হেসে বললো,– পাগল একটা। আমি মিমের কোলে মাথা রেখে বললাম,–এই কথাটা তোমার মুখে শুনতে আরও ভালো লাগে সোনা। এদিকে আমার কথা অনুযায়ী মজনু গুজব ছড়ানোয় ওস্তাদ এক মহিলাকে ডেকে বললো,– বিকেলে বটতলায় গ্রামের সবাইকে পাঁচশ করে টাকা দেয়া হবে। ব্যাস তারপর ফাইব-জি গতিতে সেই খবর পুরো গ্রামবাসীর কানে পৌঁছে গেল। বিকেলে গ্রামবাসী এসে জড়ো হলো বটতলা। মজনু হ্যান্ড মাইকে সকলের উদ্দেশ্যে বললো,– সন্মানিত গ্রামবাসী, মিলন হবে কত দিনে, আমার মনের মানুষেরও সনে। মজনুর কথা শুনে গ্রামবাসী সবাই অবাক! কিসের মধ্যে কি! গ্রামবাসীর মধ্যে বদমেজাজী একজন বললো,– এ ছ্যামড়া এ, মিলন-ফিলন পরে হইবেআনে, পাঁচশ করে টাকা দিবে নাকি শুনলাম! টাকা দে বাড়ি যাই। মজনু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,– তোমরা টাকাই চিনলা, ভালোবাসা চিনলা না। যেদিকে তাকাই শূন্যতা খুঁজে পাই, সবার সবই আছে এই মজনুর একটা লাইলি নাই। গ্রামবাসীর মধ্যে আর একজন উঠে বললো,– তোর লাইলির খ্যাতা পুড়ি, আমাগো সময় নষ্ট না করে টাকা দে চুপচাপ হারামজাদা। মজনু আবার বললো,– এই প্রেমিক মজনুর প্রেমহীন জীবনের হাহাকার শুনবার ধৈর্য যাদের নাই, তারা প্রেম ভালোবাসার কী বুঝবে! প্রেমহীন এই জাতি কিকরে বুঝবে প্রেম ভালোবাসার মর্ম! অন্যের সংসারে, প্রেম ভালোবাসায় আঙুল সঞ্চালন করা এ জাতির ধর্ম। মজনুর হাত থেকে হ্যান্ড মাইক নিয়ে আমি সকলের উদ্দেশ্যে বললাম,– টাকার কথা বলার উদ্দেশ্য আপনাদের একত্র করা, টাকার চেয়েও মূল্যবান জ্ঞান বিতরণ করাই আমার মূল উদ্দেশ্য, কারণ আপনাদের জ্ঞান দরকার। বন্ধুগণ, কাকা-কাকি, ভাই-বোন, আমার কিছু প্রশ্ন আছে আপনাদের কাছে, আশাকরি সবাই উত্তর দিবেন। প্রথম প্রশ্ন কাকা এবং কাকিদের কাছে– আপনার মেয়েকে বিয়ে দেবার পরে আপনারা কি চাননা মেয়েটা স্বামীর সংসারে সুখে থাকুক? আপনাদের মেয়ের স্বামী মেয়েকে খুব ভালোবেসে আগলে রাখুক? যদি তাই চান তাহলে এরকমই কোনো মা-বাবার মেয়েকে তার স্বামী বেশি ভালোবাসলে আপনাদের কাছে বউ পাগলা হবে কেন? মেয়েটি আপনাদের কারো নয় এর জন্য?’ সবাই চুপচাপ। আমি আবার সকলের উদ্দেশ্যে বললাম,– কী করলে খুশি হতেন আপনারা, আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে দিয়ে আমার জামাকাপড় ধোয়ালে? পেটে বাচ্চা আছে জেনেও খাটিয়ে মারলে? একটা মেয়ে মা-বাবা, ভাইবোন ছেড়ে যার ভরসায় আসে শ্বশুরবাড়ি, তার কাছে এতটুকু সহযোগিতা পাবার অধিকার কি সেই মেয়েটির নেই? সারাজীবন পাশে থাকবে বলে, আগলে রাখবে বলে যে মানুষটা শরিয়ত মোতাবেক একটি মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেই মেয়েটির দুঃখ, কষ্ট, সুখ শান্তি ভাগাভাগি করে নেবার অধিকার একজন স্বামীর, এটা দেখে জ্বালানি ছাড়াই আপনাদের কেন জ্বলে? শেষ কথা– একজন অন্তঃসত্ত্বা মেয়ের পেটের বাচ্চাকে সুস্থ রাখতে হলে মেয়েটিকে আগে সুস্থ রাখতে হবে। আমি আমার স্ত্রীর প্রতি আরও যত্নশীল, অন্তঃসত্ত্বা বলে, তাতে তোমাদের কেন জ্বলে! ওহে গ্রামবাসী, তোমাদের কেন জ্বলে? বউকে শুধু বউ না ভেবে মানুষ ভাবো, বন্ধু ভাবো। বউ বলতে তোমরা কি ভাবো, সন্তান জন্ম দেবার মেশিন? তোমার শয্যাসঙ্গী হয়ে শারীরিক তৃপ্তি আনন্দ দেবার অনুভূতিহীন যন্ত্র? তোমাদেরই শুধু বউদের কাছে চাওয়া-পাওয়া থাকবে, বউদের কোনো চাওয়া-পাওয়া থাকবেনা তোমাদের কাছে? নাকি তারা অনুভূতিহীন রোবট? সবাই চুপচাপ। একজন বৃদ্ধ লোক এগিয়ে এসে বললো,– জ্বলে জ্বলুক! তুমি চালিয়ে যাও। আর গ্রামবাসী, তোমরা চিন্তাধারা বদলাতে না পারলে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাও। একটু থেমে বৃদ্ধ আবার বললো,–তোমরা শোনোনি– ভালোবাসা ভালোবাসে শুধুই তাকে, ভালোবেসে ভালোবাসায় বেঁধে যে রাখে। একটা সংসারে ভালোবাসার পরিমাণ যতো বেশি, সেই সংসার ততো সুখী। গ্রামবাসী মাথানিচু করে ধীরে ধীরে চলে গেলো। আমি এগিয়ে গিয়ে বৃদ্ধকে বললাম,– আরে দাদু, তুমি তো হেব্বি রোমান্টিক। বৃদ্ধ আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,– আমিও তোর মতোই ছিলাম। : কি দাদু ? : বউ পাগল, তোর দাদীকে প্রচুর ভালোবাসি। আল্লাহর কাছে রোজ বলি যেন তারাতাড়ি আমাকে তোর দাদীর কাছে যাবার ব্যবস্থা করে দেয়। বুঝতেই পারছিস বিবাহ পরবর্তী সিঙ্গেল লাইফ আর ভাল্লাগেনা। : হাহাহা। রাতে বিছানায় ঠ্যাং টানটান করে শুয়ে আছি, মিম আমার পায়ের কাছে বসে আমার পায়ের পাতায় হাত দিয়ে আলতো করে চাপ দিয়ে দিতে শুরু করলো, কারণ মিম জানে আমার পা জ্বলুনি সমস্যা আছে, এবং আমার পায়ের পাতায় দুই তিন মিনিট চেপে দিলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আমি উঠে মিমকে বললাম,– আচ্ছা পায়ের পাতায় এভাবে চেপে দিলে আমার যতটা ভালো লাগে, তোমার পায়ের পাতা চেপে দিলেও তো তোমার এতটাই ভালো লাগবে মিম, শোও সোজা হয়ে। মিম মিষ্টি হেসে বললো,– খুশি হইলাম জনাব, আমার দরকার নেই। আমি চেপে ধরে মিমকে শুইয়ে মিমের পা স্পর্শ করতেই মিম বিদ্যুৎ বেগে পা সরিয়ে আমার টিশার্টের কলার ধরে টেনে শুইয়ে, আমার ওপর ঝুকে পড়ে ঠোঁটে চুমু খেয়ে মিষ্টি হেসে বললো,– ঐ ব্যাডা, খালিখালি তোমারে লোকে বউ পাগল কয়, এখন তো আমিও তোমারে বউ পাগল ডাকমু। তবে আমি নিজেকে খুব ভাগ্যবতী মনে করি তোমার মতো বউ পাগল একটা কিউট স্বামী পেয়ে। আমি মিমকে বুকের সাথে চেপে ধরে বললাম,– বউয়ের জন্য পাগল না হয়ে কার জন্য হবো, পরিমনির জন্য! লোকে বউ পাগল ডাকুক তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই, কিন্তু তাচ্ছিল্যের সুরে নয়, অবশ্যই হৃদয় থেকে বউয়ের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি থেকে হতে হবে। বেলা শেষ যে মানুষটা আগলে রাখবে তাকে ভালো না বেসে কাকে বাসবো বলো, সুখে, দুঃখে নিঃস্বার্থ সঙ্গী হয়ে যে সঙ্গ দেবে তাকে ভালো না বেসে কাকে বাসবো! মিষ্টি সুখের একটা সংসার গড়ার জন্য বউ পাগল হওয়া জরুরী, তাইতো আমি তোমার পাগল, বউ পাগল। সমাপ্ত। লেখাঃ আবীর হোসেন।1662514186

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
Post a Comment (0)

buttons=(Accept !) days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top